সকল ব্লগ
২৮ জুন, ২০২৬

উস্তাদ নির্বাচন : শর্তাবলি ও সালাফের নির্দেশনা

ইসলাম ‘সহজ’; কিন্তু সেনসিটিভ—স্পর্শকাতর। যেহেতু স্পর্শকাতর, সেহেতু সতর্কতাও চূড়ান্ত মাত্রায় জরুরি। স্পর্শকাতর এই দ্বীনের স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ইলম। কারণ—এই ইলমের সারবত্তাই দ্বীন। বিশুদ্ধ ইলম অর্জন করতে প্রয়োজন যথাযথ উস্তাদ নির্বাচন। ফলতঃ, উস্তাদ নির্বাচন ইলম অর্জনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।

উস্তাদ নির্বাচন : শর্তাবলি ও সালাফের নির্দেশনা
ইলম অর্জনের জন্য উস্তাদ গ্রহণ করতে হবে—একথা সুবিদিত ও সুপ্রমাণিত। ইলম অর্জনের এটিই নববী পদ্ধতি। নবীজির হাদিস, সাহাবাদের আমল ও সালাফদের উক্তির আলোকে এমনটিই প্রমাণিত হয়। উস্তাদ গ্রহণের কথা এলেই প্রসঙ্গ দাঁড়ায় উস্তাদ নির্বাচন-পদ্ধতির। উস্তাদ নির্বাচনের পদ্ধতি কী হবে, কাদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করা যাবে, এর জন্য কী কী শর্ত প্রয়োজন, উস্তাদের যোগ্যতা নির্ণীত হবে কীভাবে, সালাফে সালিহিন কীভাবে উস্তাদ নির্বাচন করতেন—সালাফের আমল ও নির্দেশনার আলোকে প্রাসঙ্গিক এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা এই লেখায় অনুসন্ধান করার চেষ্টা করব। ইসলাম ‘সহজ’; কিন্তু সেনসিটিভ—স্পর্শকাতর। যেহেতু স্পর্শকাতর, সেহেতু সতর্কতাও চূড়ান্ত মাত্রায় জরুরি। স্পর্শকাতর এই দ্বীনের স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ইলম। কারণ—এই ইলমের সারবত্তাই দ্বীন। বিশুদ্ধ ইলম অর্জন করতে প্রয়োজন যথাযথ উস্তাদ নির্বাচন। ফলতঃ, উস্তাদ নির্বাচন ইলম অর্জনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। এই ইলম নিছক ইলম নয়; ইলম বরং দ্বীন। এই বক্তব্য আমার নয়। জগদ্বিখ্যাত তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনে সিরিনের। বিখ্যাত তাবিয়ী ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. (১১০ হি.) বলেন, “নিশ্চয় এই ইলম হলো দ্বীন। সুতরাং তোমরা কার কাছ থেকে দ্বীন গ্রহণ করবে, ভালোমতো অনুসন্ধান করে নাও”।[সহিহ মুসলিম ১/১১, ইমাম মুসলিমের ভূমিকা; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, আসার নং-২৬৬৩৬] ইলমে দ্বীন অর্জনের পদ্ধতি ও শর্তাবলি আলোচনার ক্ষেত্রে সালাফদের যে-ক’টি বক্তব্য ফান্ডামেন্টাল হওয়ার দাবি রাখে, ইবনে সিরিনের এই বক্তব্য তার অন্যতম। বলাবাহুল্য, কুরআন, হাদিস এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট তাফসির ও উলুমুল কুরআন, শারহুল হাদিস ও উলুমুল হাদিস, ফিকহ ও উলুমুল ফিকহ—এই সবকিছুই ইলম। এবং এই ইলমের সামষ্টিক রূপই শরিয়াহ বা দ্বীন। অর্থাৎ, ইসলামি শরিয়াহ দাঁড়িয়েই আছে ইলমের ভিত্তির ওপর। এর কোনোটি ভেঙে পড়ার মানে হলো—শরিয়ার একটি ভিত ভেঙে পড়া। কেননা, নবীজি, সাহাবা ও সালাফদের ব্যাখ্যা, বক্তব্য ও আমলের আলোকে কুরআন ও হাদিসের সামষ্টিক রূপই শরিয়ার রূপ। একারণে, উলুমে শরিয়ার প্রতিটি শাস্ত্রের যেমন উসুল ও মূলনীতি আছে, তেমনি সামগ্রিকভাবে উলুমে শরিয়া অর্জনেরও আছে নির্দিষ্ট উসুল ও মূলনীতি। আর এর সর্বপ্রথম ধাপ হচ্ছে—উস্তাদ নির্বাচন করা। ইবনে সিরিন কেন এই কথা বললেন, কোত্থেকে এই ফিকরা পেলেন, কাদের অধীনে তাঁর ইলমি তারবিয়ত হয়েছে, কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন? ইবনে সিরিনের বক্তব্য বুঝতে হলে এই প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি তাঁর সময় ও অবস্থান বুঝতে হবে। ইবনে সিরিন রহ. জন্মগ্রহণ করেন ৩২ হিজরিতে। মুসলিম বিশ্বে তখন খেলাফতে রাশেদা চলছে। খেলাফতের দায়িত্ব পালন করছেন দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। যার সময়ে শরিয়া ও উলুমে শরিয়া নিয়ে কোনো অপব্যাখ্যা করার সাহস কারও ছিল না। ইবনে সিরিন যখন জন্মগ্রহণ করেন, আশারায়ে মুবাশশারার একাধিক সাহাবি সহ অধিকাংশ বড় সাহাবিই তখন জীবিত। প্রত্যেকেই নিজ-নিজ পরিসরে দ্বীন ও ইলমে দ্বীন প্রচার-প্রসারের কাজ করে যাচ্ছেন। মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ.-এর ইলম অর্জনের হাতেখড়ি থেকে নিয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ, সিংহভাগটাই হয়েছে সাহাবিদের হাত ধরে। তাঁর ইলম অর্জন শুরু হতে-হতে কিছু বড় সাহাবির ইন্তেকাল হয়ে গেলেও অনেক বড় সাহাবি তখনো জীবিত ছিলেন। শেষদিকের তো অনেকেই জীবিত ছিলেন। ইবনে সিরিনের ইলমি ব্যুৎপত্তি যাদের হাত ধরে হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, ইমরান ইবনে হুছাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ দশ বছরের একান্ত খাদেম আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু। এই পাঁচজনের মধ্যে চারজনই প্রথম সারির আলিম সাহাবি।[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৪/৬০৬] অন্যান্য তাবিয়ীর থেকে ইলম অর্জন করলেও ইবনে সিরিন রহ.-এর ইলমি ভিত, শরিয়া সম্পর্কে মনোভাব ও চিন্তাজগত—এগুলো গড়ে উঠেছিল মূলত উপরোক্ত চারজন বিজ্ঞ সাহাবির তত্ত্বাবধানে। ফলতঃ, ইবনে সিরিনের এই বক্তব্য নিছক তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়; বরং উপরোক্ত চারজন প্রথম সারির আলিম সাহাবির ইনফ্লুয়েন্স ও সমকালীন পরিবেশের ইলমি চিন্তাজগতের প্রতিচ্ছবি। এই চিন্তা ও মনোভাব যে কেবল মুহাম্মাদ ইবনে সিরিনের ছিল, তা নয়। বরং সালাফদের প্রায় সকলেই এই ফিকরা লালন করতেন। কারণ, তাঁরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে চলে আসা ইলমি সিলসিলায় এর অন্যথা পাননি। আরেকটি বক্তব্য উল্লেখ করে এর প্রমাণ দিই। ইবনে সিরিনের সমসাময়িক আরেক বিখ্যাত ইমাম হলেন তাবিয়ী ইবরাহিম নাখয়ী রহ. (৯৬ হি.)। হানাফি মাযহাবের ফিকহি সিলসিলায় ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পর যিনি প্রধান পুরুষ। বয়সে ইবনে সিরিনের চেয়ে পনেরো বছর ছোট হলেও ইন্তেকাল করেছেন তাঁর পনেরো বছর আগে। ৪৭ হিজরি থেকে ৯৬ হিজরি—প্রায় পঞ্চাশ বছরের জীবনে এটি ছিল তাঁর সমকাল। তবে ইবনে সিরিনের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো—ইবরাহিম নাখয়ীর ইলমি ব্যুৎপত্তি ঘটেছে প্রধান-প্রধান তাবিয়ীদের হাত ধরে। একাধিক সাহাবির সাক্ষাৎ-সান্নিধ্য পেলেও ইলমি সোহবত পাননি। দুজনের উস্তাদগত পার্থক্য হয়ে গেলেও সমকালীন পরিবেশের প্রভাবে চিন্তাগত জায়গায় উভয়েই ছিলেন এক। মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন উসুলী আঙ্গিকে কথা বললেও ইবরাহিম নাখয়ী তুলে ধরেছেন সমকালীন পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র। তিনি বলেন, “ইলম অন্বেষণকারীরা যখন কোনো উস্তাদের কাছে ইলম অর্জনের জন্য যেতেন, তখন তাঁরা উস্তাদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতেন। তাঁর নামাজ ও সামগ্রিক অবস্থার খোঁজখবর করতেন। তারপর ইলম অর্জন করতেন।”[আল-জামি লি-আখলাকির রাবি ওয়াস সামি ১/১২৮] অর্থাৎ, আগে উস্তাদের অবস্থা যাচাই করতেন, তারপর ইলম গ্রহণ করতেন। কারণ, ইলমের সমষ্টিগত রূপই দ্বীন। আর, দ্বীন যার-তার কাছ থেকে গ্রহণের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন উস্তাদের যথাযথ যোগ্যতা ও শর্তাবলির সন্নিবেশ। প্রসঙ্গত বলাবাহুল্য, তাবিয়ীরা এই উসুল ও মূলনীতি পেয়েছেন সাহাবিদের সোহবত-সান্নিধ্যে। তাহলে সাহাবিরা পেয়েছেন কার সান্নিধ্য থেকে? তাবিয়ীদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশের দিকে তাকালেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। উস্তাদ নির্বাচনে সালাফদের সতর্কতা ও শর্তাবলি সালাফে সালিহিন উস্তাদ নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করতেন; বিভিন্ন শর্তাবলির প্রতি লক্ষ করতেন। কারণ, উস্তাদ হলো একজন ইলম অন্বেষণকারীর আকিদা, ইলম, ফিকির, আমল ও চিত্ত গঠনের কারিগর। একজন মানুষের চিন্তাজগত বিনির্মাণের পিছনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও ইনফ্লুয়েন্স থাকে তার পড়াশোনা ও উস্তাদের। এরপর পরিবেশ ও প্রতিবেশের। একজন মানুষের জীবনের সর্বপ্রথম অনুসরণীয় ব্যক্তি হয়ে থাকেন বাবা-মা। বোধ-বুদ্ধি গঠিত হওয়ার পর প্রধান অনুসরণীয় মানুষে পরিণত হয় উস্তাদ ও শিক্ষক। পড়াশোনার পাশাপাশি সোহবত (সান্নিধ্য), হেদায়েত (পথপ্রদর্শন) ও তাওজিহাতের (দিক-নির্দেশনার) মাধ্যমে উস্তাদ হয়ে ওঠেন তার প্রধান গুরু। ফলতঃ, প্রধানত উস্তাদই পরোক্ষভাবে নির্ধারণ করে দেন একজন মানুষের কর্মপন্থা ও পথচলা কেমন হবে এবং কীভাবে পরিচালিত হবে। বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কেমন হবে এবং কদ্দূর হবে; এও নির্ধারিত হয় সাধারণত উস্তাদের সোহবত ও সান্নিধ্যেই। একজন আল্লাহভীরু উস্তাদ ছাত্রের মাঝে পরোক্ষ তাওয়াজ্জুহ (প্রভাব) ও ইনফ্লুয়েন্সের মাধ্যমে তাকওয়ার বীজ বুনে দেন। এরপর সোহবতের সতর্ক পরিচর্যার মাধ্যমে ইলমের পাশাপাশি তাকওয়ার বীজকে চারা ও গাছে পরিণত করে তোলেন। এজন্য, ইলম অর্জনের আগে উস্তাদ নির্বাচনে সতর্কতা ও শর্ত রক্ষা জরুরি। সালাফে সালিহিন কীসব শর্ত রক্ষা করতেন? কী কী নির্দেশনা তাঁরা অনুসরণ করতেন? কোন মূলনীতির আলোকে উস্তাদ নির্বাচন করতেন? তাঁদের বিভিন্ন আমল ও কর্মপন্থা থেকে আমরা এখন এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। ক. উস্তাদকে আলিম হতে হবে ইলম অর্জনের জন্য যেহেতু উস্তাদ নির্বাচন, সেহেতু বলাবাহুল্য—উস্তাদকে আলিম হতে হবে। কীভাবে চিনব আলিম? কী তাঁর পরিচয়? ইলম জানলেই কেবল আলিম হওয়া যায় না; আলিম বলা হয় তাঁকে, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলার ভয় আছে। এজন্য কুরআনে কারিমে আলিমের বৈশিষ্ট্য হিসেবে যে-কথাটি বলা হয়েছে, তা হলো—“নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালাকে (প্রকৃত) ভয় করে একমাত্র আলিমগণ।”[সূরা ফাতির ৩৫ : ২৮] উক্ত আয়াতে ‘একমাত্র’ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি হলো ‘ইন্নামা’। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে যা সীমাবদ্ধতা ও সুনির্দিষ্টতা বোঝায়। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালাকে প্রকৃতভাবে ভয় করার বৈশিষ্ট্য একমাত্র আলিমদের মধ্যে থাকে। সুতরাং এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শুধু ইলম জানলেই হবে না; আলিম হতে হলে হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার ভয় থাকতে হবে। আলিমের এই পরিচয়টি বাহ্যত কঠিন ও রূঢ় মনে হলেও সাহাবা-সালাফদের কাছে আলিম হওয়ার এটিই ছিল মূলনীতি। নয়তো, সেকালে অসংখ্য উস্তাদের কাছে হাদিস পড়েও ‘আলিম’ হতে পারেননি—এমন নজির সালাফদের জীবনীতে প্রচলিত আছে। পরিচয়টি আরও স্পষ্ট করতে তাঁদের জবানিতেই শোনা যাক। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু (৩২ হি.)। ইলমের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “ইলম কেবল প্রচুর হাদিস জানার নাম নয়; ইলম হলো একমাত্র আল্লাহ তাআলার ভয়।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ১/৭৫৮-৭৫৯, বর্ণনা নং-১৪০১, ইবনে আব্দুল বার, দার ইবনুল জাওযি] অন্যত্র বলেন, “তোমরা ইলমের রক্ষক হও; নিছক বর্ণনাকারী হইও না। কারণ, বর্ণনাকারী না হয়েও ইলম সংরক্ষণ করা যায়, আবার অনেকে ইলম বর্ণনা করলেও সংরক্ষণকারী নয়।”[হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ৭/২৬২, দারুল কিতাবিল আরাবি] এই কথার তাৎপর্য বুঝতে হলে ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইলমি অবস্থান বুঝতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম নবীজির সোহবতের বরকতে প্রত্যেকেই সাধারণভাবে শরয়ি বিষয়ের আলিম ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে কিছু সাহাবি ইলম অর্জনে আত্মোৎসর্গ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেদেরকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সার্বক্ষণিক নবীজির সোহবত গ্রহণ, ইলম সংরক্ষণে তৎপরতা—ইত্যাদি কারণে খোদ সাহাবাদের মধ্যে তাঁদের আলাদা কদর তৈরি হয়েছিল। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথাই ধরা যাক। হযরত আবু হুরায়রার সার্বক্ষণিক কাজ ছিল নবীজির সোহবতে থেকে তাঁর বক্তব্য ও আমল সংরক্ষণ করা। যেকারণে সাহাবায়ে কেরাম কোনো বিষয়ে নবীজির হাদিস জানার প্রয়োজন হলে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বারস্থ হতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ইলমের জন্য এমন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবি। তবে, হযরত আবু হুরায়রা থেকে ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্বাতন্ত্র্য হলো—তিনি নিছক হাদিসই জানতেন না; বরং সেই হাদিস ও কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা ও নিগূঢ় তত্ত্বও জানতেন। সেই বিবরণ নিজেই দিচ্ছেন—“ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, কুরআনে যতগুলো সূরা আছে, সবগুলোর ব্যাপারে আমি জানি—সূরাটি কোথায় নাযিল হয়েছে। যতগুলো আয়াত আছে, আমি জানি—কোন বিষয় ও প্রেক্ষাপটে তা নাযিল হয়েছে। যদি আমি জানতে পারি, কুরআন সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে, উটে চড়ে যার কাছে পৌঁছা সম্ভব, তাহলে অবশ্যই আমি তার কাছে সফর করব।”[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৪৬৩] ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শুধু হাদিস ও কুরআনের তাফসির সম্পর্কেই শ্রেষ্ঠ আলিম ছিলেন না। বরং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে-ক’জন শ্রেষ্ঠ ফকিহ, ইবনে মাসউদ ছিলেন তার বিশেষ জন। তাঁর এই ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি সাহাবিদের কর্মপন্থা ও নিজ ভাষ্যে স্পষ্টতঃ পাওয়া যায়। একারণে দেখা যায়, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে যখন কুফা শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন তার গভর্নর ও প্রধান ইলমি ব্যক্তিত্ব নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন আমার ইবনে ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন গভর্নর হিসেবে; এবং ইবনে মাসউদকে নিয়োগ দেন কুফার লোকদের ইলমি অভিভাবক হিসেবে। তাদেরকে কুফায় প্রেরণের সময় সাথে দেওয়া ফরমাননামায় লেখেন—“আমি তোমাদের কাছে আমারকে গভর্নর হিসেবে এবং ইবনে মাসউদকে মুআল্লিম ও উজির হিসেবে পাঠালাম। তাঁরা দুজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্ভ্রান্ত সাহাবি। সুতরাং তোমরা তাঁদের নির্দেশ মানবে এবং তাঁদের অনুসরণ করবে।” এটুকু বলার পর হযরত উমর যে বাক্যটি লেখেন, তাতে ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি ফুটে ওঠে। হযরত উমর লেখেন, “আর, আমি আব্দুল্লাহর ইলমের প্রতি আমার নিজের প্রয়োজনের চেয়ে তোমাদেরকে অগ্রাধিকার দিলাম।”[আত-তাবাকাতুল কুবরা ৬/৮৮, ইবনে সাদ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ] অর্থাৎ, ইবনে মাসউদের মতো আলিম খলিফার পাশে থাকা প্রয়োজন ছিল। উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সেই প্রয়োজন বোধ করেছেন। কিন্তু, কুফার মানুষের দিকে তাকিয়ে তিনি এই প্রয়োজন ত্যাগ করেছেন। চতুর্থ খলিফা হযরত আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন কুফাকে রাজধানী বানিয়ে আগমন করেন, ইবনে মাসউদ তখন ছাত্রদের নিয়ে খলিফাকে অভ্যর্থনা জানান। খলিফা এসে ইবনে মাসউদের দরসের হালাকা ও ছাত্রসংখ্যা দেখে অবাক ও অভিভূত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইতিহাসখ্যাত কুফার ইলমি ভিত তৈরি হয় ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিলসিলা অনুসরণ করে। আলিম হতে হলে আল্লাহভীরু হতে হবে—এই বক্তব্য শুধু ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নয়। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি ছাড়া আলিম হওয়া যায়? কিংবা, আলিম না হয়ে প্রকৃত মুত্তাকি হওয়া যায়? সাহাবায়ে কেরামের মতে একটাকে ছাড়া অপরটা হতে পারে না। এজন্য হযরত আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আলিম না হবে, ততক্ষণ প্রকৃত খোদাভীরু হতে পারবে না। আবার, ইলম অনুযায়ী যতক্ষণ পর্যন্ত আমল না করবে, ততক্ষণ তোমার ইলম সুন্দর হবে না।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়াফলিহি ১/৬৯৮, বর্ণনা নং-১২৩৯, ইবনে আব্দুল বার, দার ইবনুল জাওযি] সুতরাং, আলিম হতে হলে হৃদয়ে আল্লাহর ভয় থাকতে হবে। একইভাবে, প্রকৃত আল্লাহভীরু হতে হলে ইলম অর্জন করতে হবে। এজন্য হযরত আবু দারদা বলেন, “সে কীসের মুত্তাকি হবে? কীসের তাকওয়া অর্জন করবে, সেটিই তো জানে না!”[প্রাগুক্ত] খ. ইলম অনুযায়ী আমল করা উস্তাদকে নিছক বাহ্যত আলিম হলেই হবে না; ইলম অনুযায়ী আমল করতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম তো বটেই; সাহাবিদের সান্নিধ্যে ইলম হাসিল করা তাবিয়ীগণও আলিমের জন্য ইলম অনুযায়ী আমলের শর্ত দিয়েছেন। হযরত হাসান বসরি রহ. (১১০ হি.) বলেন, “আলিম হলো ওই ব্যক্তি, যার আমল হয় ইলম অনুযায়ী। যার ইলমের সাথে আমলের মিল নেই, তা নিছক বর্ণনা মাত্র; একটা কিছু শুনেছে আর বলে দিয়েছে।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ১/৬৯৮, বর্ণনা নং-১২৪১, ইবনে আব্দুল বার, দার ইবনুল জাওযি] এজন্য সুফিয়ান সাওরি রহ. (১৬১ হি.) বলেন, “ইলম মানুষকে আমলের দিকে ডাকে। যদি সে সাড়া না দেয়, তাহলে ইলম চলে যায়।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ১/৭০৬, বর্ণনা নং-১২৭৪, ইবনে আব্দুল বার, দার ইবনুল জাওযি] নিছক তথ্য ও রেফারেন্স কপচানোর নাম ইলম নয়। বরং ইলম বর্ণনার সাথে আমলও প্রয়োজন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথাটি এখানে খুব চমৎকারভাবে আমাদের আলোচনার সাথে মিলে যায়। তিনি বলেন, “সুন্দর করে (ইলমি) কথা তো সবাই-ই বলতে পারে। তবে, যার কথা (ইলম) ও আমলে মিল থাকে, সে মূলত ইলম অর্জন করেছে। আর যার কথা ও কাজে (ইলম ও আমলে) মিল নেই, সে মূলত নিজেকে কলুষিত নিন্দার পাত্র বানাচ্ছে।” ”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি ১/৬৯৬, বর্ণনা নং-১২৩৩, ইবনে আব্দুল বার, দার ইবনুল জাওযি] আমলবিহীন আলিমের ব্যাপারে হাদিস হুঁশিয়ারি ও সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসের ভাষ্যমতে, পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে মানুষ কেয়ামতে পার পাবে না। এর একটি হলো—ইলম অনুযায়ী আমল করেছে কি না।[সুনানুদ দারিমি, হাদিস নং-৫৫৬] একজন আহলে ইলম কখন প্রকৃত আলিম বলে বিবেচিত হবেন? ইমাম আবু ইসহাক শাতিবি রহ. (৭৯০ হি.) আলিমের তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। এর প্রথমেই লেখেন, “প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো—ইলম অনুয়ায়ী আমল করা। তার কথা ও কাজে মিল থাকতে হবে। যদি সে যা বলে তা নিজেই না মানে, তাহলে এই লোক থেকে ইলম গ্রহণ করা হবে—এর যোগ্য নয় সে। ইলমি ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হবারও উপযুক্ত নয়।”[আল-মুওয়াফাকাত ১/১৪১, শাতিবি, দার ইবনে আফফান] অর্থাৎ, উস্তাদ হওয়ার জন্য শর্ত হলো—ইলম অনুযায়ী তাকে আমল করতে হবে। বলাবাহুল্য, এই শর্তগুলো তিনি আলোচনা করেছেন ইলম কাদের থেকে গ্রহণ করা যাবে, এই আলোচনার অধীনে। যে-কারণে দেখা যায়, এই আলোচনার শুরুই করেছেন তিনি এভাবে—“প্রকৃত ইলম অর্জনে সহায়ক সবচেয়ে উপকারী পদ্ধতি হলো, পূর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত আহলে ইলমদের থেকে ইলম হাসিল করা।”[আল-মুওয়াফাকাত ১/১৩৯, শাতিবি, দার ইবনে আফফান] গ. দীর্ঘদিন নির্ভরযোগ্য উস্তাদদের সোহবতে ইলম অর্জন করা সঠিক ইলম অর্জনের জন্য দীর্ঘদিন উস্তাদের সোহবতের বিকল্প নেই। সালাফদের মানহাজ ছিল, যেকোনো বিষয়ে দক্ষতা ও পরিকপক্বতা অর্জনের জন্য দীর্ঘদিন উস্তাদের সোহবতে পড়ে থাকা। এর অন্যতম কারণ হলো—নিছক নিয়মতান্ত্রিক দরস থেকে অনেক সময় যে-বিষয় সমাধান হয় না, সোহবত থেকে তার সমাধান পাওয়া যায়। সালাফদের এই সিলসিলা সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম থেকে প্রাপ্ত। সাহাবায়ে কেরাম দীর্ঘদিন রাসূলের সোহবতে থেকে ইলম হাসিল করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ও যায়দ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতো অসংখ্য সাহাবি অধিকাংশ সময় নবীজির দরবারে পড়ে থাকতেন। যার সোহবতের পরিমাণ যত বেশি ছিল, তাঁর শরয়ি ইলমের পরিমাণও তত বেশি ছিল। ইমাম শাতিবি রহ. এই শর্তের অধীনে লেখেন, সাহাবায়ে কেরাম ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় আরোহণ করেছেন নবীজির সার্বক্ষণিক ও দীর্ঘ সোহবতের কারণে। বলাবাহুল্য, যেকোনো শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘদিন শাস্ত্রীয় ও দক্ষ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে শেখার ধারা অব্যাহত রাখা জরুরি। উলুমে ইসলামিয়া যেহেতু সকল শাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর, এর সাথে দ্বীন ও ঈমান জড়িত, তাই এই শর্তের প্রয়োগ এক্ষেত্রে আরও কঠোর ও যথার্থ। এজন্য উস্তাদ নির্বাচনের পূর্বে দেখতে হবে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তি দীর্ঘদিন উস্তাদের সান্নিধ্যে থেকে ইলম হাসিল করেছেন কি না। ঘ. উস্তাদদের ইলমের অনুসরণ করা এই শর্তটি ও এর গূঢ় রহস্য বোঝা জরুরি। উস্তাদদের ইলমের অনুসরণ করার অর্থ হলো—যেকোনো শাস্ত্রে কথা বলতে হলে, নিজে থেকে কোনোকিছু না বলে উস্তাদদের সিলসিলা ও রেফারেন্সে কথা বলা। ইলম অর্জনের নববী সিলসিলায় আমরা এমনটাই দেখে এসেছি। সাহাবায়ে কেরাম অনুসরণ করেছেন নবীজির, তাবিয়ীগণ অনুসরণ করেছেন সাহাবায়ে কেরামের, তাঁবে তাবিয়ীগণ অনুসরণ করেছেন তাবিয়ীগণের। অর্থাৎ, প্রত্যেক যুগেই ইলমি সিলসিলার পূর্ববর্তী আলিমদের অনুসরণের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থেকেছে। এই শর্তের গূঢ় রহস্য বয়ান করতে গিয়ে ইমাম শাতিবি রহ. বলেন, “যখনই পূর্ববর্তী আলিমদের অনুসরণের এই ধারা পরিহার করা হয়েছে, তখনই বিদআত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কারণ, অনুসরণ পরিহার করার মানে হলো—পরিহারকারীর কাছে নতুন কোনো বিষয়ের উদ্ভব ঘটেছে। যার মূল হলো—প্রবৃত্তির অনুসরণ।”[আল-মুওয়াফাকাত ১/১৪৫, শাতিবি, দার ইবনে আফফান] ঙ. এক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য উস্তাদের স্বীকৃতি থাকা যিনি উস্তাদ হবেন, তারও আছে উস্তাদ। সেই উস্তাদের যদি স্বীকৃতি থাকে তাঁর যোগ্যতা ও উপযুক্ততার পক্ষে, তবেই তিনি নির্দ্বিধায় উস্তাদ হতে পারেন। এমনটাই ছিল সালাফে সালিহিনের মানহাজ ও কর্মপন্থা। কারণ, ছাত্রের যোগ্যতা ও উপযুক্ততা সম্পর্কে উস্তাদের চেয়ে বেশি ওয়াকিফহাল আর কেউ নন। এজন্য ইমাম মালিক রহ. বলেন, “কোনো ব্যক্তির পক্ষে নিজেকে ইলমি কোনো কাজের জন্য যোগ্য মনে করা সমীচিন নয়; যতক্ষণ না সে তার চেয়ে বিজ্ঞ কোনো আলিমকে নিজের যোগ্যতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে নেয়। আমি আমার উস্তাদ রবিয়াতুর রায় ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদকে আমার যোগ্যতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার আগ পর্যন্ত ফতোয়া দেওয়া শুরু করিনি। তাঁরা উভয়েই আমাকে ফতোয়া দেওয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি তাঁরা আমাকে নিষেধ করতেন, তাহলে আমি বিরত থাকতাম।”[হিলইয়াতুল আউলিয়া ৬/৩১৬] একই ঘটনা আমরা দেখতে পাই ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর ক্ষেত্রে। তাঁর বিশিষ্ট উস্তাদ হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান রহ.-এর স্বীকৃতি লাভের আগ পর্যন্ত তিনি দরসের মসনদে বসেননি। মাঝে একবার উস্তাদের অনুমতি ছাড়া দরসপ্রদান শুরু করলেও উস্তাদ জানার পর দরস বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে উস্তাদের স্বীকৃতির কারণে তাঁর দরস এতটাই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, ইন্তেকালের সময় হাম্মাদ তাঁকে নিজ দরসের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে যান। হাম্মাদের ইন্তেকালের পর থেকে ইমাম আবু হানিফা উস্তাদের মসনদে বশ্যে দরস দিতে থাকেন। ফিকহি ক্ষেত্রে হাম্মাদ রহ.-এর প্রশ্নাতীত গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাঁর যোগ্য স্থলবর্তী হিসেবে ইমাম আবু হানিফার দরসও খুব দ্রুত প্রসিদ্ধি লাভ করে। সুতরাং উস্তাদ নির্বাচনের আগে খোঁজ নিতে হবে, যোগ্যতা ও উপযুক্ততার ব্যাপারে তার উস্তাদদের স্বীকৃতি আছে কি না। চ. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকিদা ও সালাফে সালিহিনের মানহাজের অনুসারী হওয়া ছ. ইলমি ব্যস্ততায় মশগুল থাকা জ. দুনিয়াবি সম্পদের প্রতি নির্মোহ ও নির্লোভ হওয়া ঞ. ইলমকে দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের সিঁড়ি না বানানো ট. হারাম, নিকৃষ্ট, মাকরুহ ও অরুচিশীল উপার্জন থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা ঠ. শরিয়তের সুন্নাহ ও নফলের প্রতি যত্নবান হওয়া ড. ব্যক্তিত্ব ও অবস্থান নষ্ট করে—এমন বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা ঢ. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা থাকা উস্তাদ নির্বাচনের এই শর্তগুলো সালাফদের বিভিন্ন বক্তব্য ও আমলের মাধ্যমে প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়। বলাবাহুল্য, উপরের শর্তগুলো সব ‘ফরজ’ পর্যায়ের নয়। কিছু আছে ‘ফরজ’ পর্যায়ের, কিছু আছে ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’ পর্যায়ের। ‘নফল’ পর্যায়ের আরও কিছু শর্ত চাইলে যুক্ত করা যেতে পারে। কিছু শর্ত আবার এমন আছে, যেগুলো একটির অধীনে একাধিক শর্ত ধারণ করে। সচেতন পাঠক মনোযোগ দিয়ে আলোচনার ধরন খেয়াল করলে বিষয়গুলো ধরতে পারবেন। সালাফে সালিহিনের অনুসৃত এই শর্তগুলো রক্ষা করা গেলে যথাযথ উস্তাদ নির্বাচন করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ।