২৮ জুন, ২০২৬
সালাফের দৃষ্টিতে উস্তাদ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা
ইলম অর্জন করতে গেলেই প্রয়োজন হবে উস্তাদের। উলুমে ইসলামিয়াতে স্বশিক্ষা বা উস্তাদবিহীন ইলম অর্জনের কোনো স্থান নেই। নিছক দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রেই নয়; এই মূলনীতি পৃথিবীর সকল জ্ঞান ও শাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেকোনো শাস্ত্রের প্রাথমিক ধারণা অর্জন করতেও প্রয়োজন হয় দক্ষ শিক্ষকের। একজন ডাক্তার তখনই আস্থাভাজন হতে পারেন, যখন তার শিক্ষা হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে। স্বশিক্ষিত ডাক্তারের যেমন চিকিৎসার স্বীকৃতি নেই, স্বশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারেরও অনুমতি নেই ইমারত নির্মাণের। এটা হলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তিগতভাবেই মানুষ শিক্ষার ক্ষেত্রে উস্তাদের মুখাপেক্ষী। জান্নাতে হযরত আদম আলাইহিসসালামকে আল্লাহ তাআলা এই পদ্ধতিতেই সকল বস্তুর নামের ইলম শিক্ষা দিয়েছিলেন।
বস্তুগত ইলমের ক্ষেত্রেই যেখানে উস্তাদ ও শিক্ষকের প্রয়োজন, ইলমে দ্বীনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তার প্রয়োজন কতটা—তা বলাবাহুল্য। ইলমে দ্বীনের নানা শাখা-প্রশাখা রয়েছে। আকিদা, ইবাদত, মুয়ামালাত, তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধি ও সবল-দুর্বল নির্ণয়—এই সবগুলো হয়তো সরাসরি শরিয়াহর অন্তর্ভুক্ত; নয়তো এর ওপর শরিয়াহর বিধান নির্ভরশীল। অর্থাৎ, ইলমে দ্বীনের সবকিছু ওতপ্রোতভাবে শরিয়াহর সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং, এই শাস্ত্রগুলোর পঠনপাঠন হতে হবে সালাফে সালিহিনের অনুসৃত পথ ও পন্থার আলোকে; উসুলে শরিয়াহর অনুসরণে।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে নিয়ে বর্তমান—সর্বযুগেই ইলম অর্জনের প্রধান উপায় ছিল সরাসরি উস্তাদের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ। সোনালী যুগে একজন ইলম অন্বেষণকারীর উস্তাদ থাকাকে বংশধারার মতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো। উস্তাদবিহীন শিক্ষার্থীকে মনে করা হতো বংশ-পরিচয়হীন সন্তানের মতো। ইমাম নববীর কথাই ধরা যাক। পূর্ববর্তী আলিমদের জীবনী রচনার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, “তাঁরা আমাদের ইমাম ও সালাফে সালিহিন। আমাদের পরিচয়ের জন্য তাঁরা পিতামাতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”[তাহযিবুল আসমা ওয়াল লুগাত ১/১১, নববী]
সালাফে সালিহিনরা ক্ষেত্রবিশেষে পিতামাতা ও পূর্বপুরুষের চেয়ে উস্তাদদের প্রতি বেশি অনুরক্ত থাকতেন। তাঁরা মনে করতেন, তাদের জীবনে পিতামাতার চেয়ে উস্তাদদের অবদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পিতামাতা দেহের খোরাক জোগালেও উস্তাদগণ জুগিয়েছেন আত্মার খোরাক। ইমাম মালিকের প্রিয় ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহবের কথাই ধরুন। সারাদিন পড়ে থাকতেন উস্তাদের দরবারে। ইমাম মালিকের প্রতি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন, জীবনের ধ্যানজ্ঞান বানিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর ইলমি মজলিসকে। উস্তাদের অবদানের কথা স্বীকার করে তাঁর করা উক্তিটি ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে যত্নের সাথে; “যদি দেখা না পেতাম ইমাম মালিক ও লাইস ইবনে সা’দের, তাহলে আজ গোমরাহ হয়ে পথে-পথে ঘুরতাম।”[তারিখে দিমাশক ৫০/৩৫৯, ইবনে আসাকির]
ইবনে ওয়াহব নিজে যেমন উস্তাদকে ভালবেসেছেন, তাঁর ছাত্ররাও তাকে তেমনি ভালবেসেছে। পরবর্তী জীবনের কথা বলি।
ইবনে ওয়াহব দরসের হালাকা নিয়ে বসেছেন। এক ভিক্ষুক এসেছে দরবারে। এসেই উঁচু আওয়াজে তাকে বলতে শুরু করল, আবু মুহাম্মাদ, গতকাল আমাকে যে দিরহামটা দিয়েছেন, সেটা জাল।
—‘আমি তো জানি না ভাই। এটা আরেকজন আমাকে দিয়েছে।’ ইবনে ওয়াহব বললেন।
ভিক্ষুক রাগ হয়ে গজরাতে শুরু করল, ‘আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি শান্তি বর্ষণ করুন। এই যুগ সম্পর্কেই তিনি হাদিসে বলেছিলেন, একটা সময় আসবে, যখন এই উম্মতের মুনাফিকরা দান-সাদাকা করবে।’
ভিক্ষুকের আস্পর্ধা দেখে দরস থেকে এক ইরাকি ছাত্র উঠে গেলেন। শক্ত করে ভিক্ষুকের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। সুর পাল্টে ভিক্ষুক হাউমাউ করে চিৎকার করে ইবনে ওয়াহবের কাছে অভিযোগ জানাল, ‘হে আবু মুহাম্মাদ, হে ইমামুল মুসলিমিন, আপনার মজলিসে আমার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে? আপনি কিছুই বলবেন না?’
—‘কে করেছে?’ ইবনে ওয়াহব জানতে চাইলেন। ইরাকি ছাত্রটি দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিলেন, ‘আমি করেছি উস্তাদ! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।... আপনি আমাদের ইলমের পথের আলোকবর্তিকা। আমাদের সামনে সে আপনার গিবত করার আস্পর্ধা পায় কোথায়?’[তারতিবুল মাদারিক ওয়া তাকরিবুল মাসালিক ৩/২৩৭-২৩৮, কাজি ইয়াজ]
প্রিয় উস্তাদের প্রতি ভিক্ষুকের অপমান ইরাকি ছাত্রটি মেনে নিতে পারেনি। কেন? কারণ, উস্তাদ তাঁর জীবনের পথপ্রদর্শক, হিদায়াত ও ইলমের পথের আলোকবর্তিকা।
ইবনে ওয়াহব (১৯৭ হি.) রহ. দ্বিতীয় শতকের মানুষ। পরবর্তী শতকের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। হিজরি তৃতীয় শতকের একজন প্রভাবশালী আলিম হলেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (২৪১ হি.) রহ.। খলিফা মু’তাসিমের সময় যখন খলকে কুরআনের ফিতনা চলছে, মু’তাসিম তাকে বললেন, ‘আপনি ইবনে আবি দুআদের সাথে কথা বলুন।’ ইমাম আহমাদ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এমন লোকের সাথে কীভাবে আমি কথা বলি, যাকে কখনো কোনো আলিমের দরজায় দেখিনি?’[আল-ইলমা, পৃ. ২৮]
ইতিহাসে দেখা যায়, ইমাম আহমাদ নির্যাতন মেনে নিলেও ইবনে আবি দুআদের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যাননি। কারণ, তাঁর ইলমি গায়রত একজন উস্তাদবিহীন লোকের সাথে ইলমি বিষয়ে আলোচনা করতে বাধা দিচ্ছিল।
আবারও দ্বিতীয় শতকে ফিরে যাই। ইমাম আযম আবু হানিফা (১৫০ হি.) রহ.-এর পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা সর্বস্বীকৃত ও সর্বজনবিদিত। ইলমুল ফিকহে তাঁর অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ইমাম আবু হানিফা একদিন জানতে পারলেন, তাঁর পার্শ্ববর্তী মজলিসে একটি হালাকা বসেছে। ফিকহি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনা করে। সঙ্গীদের কাছে জানতে চাইলেন, তাদের হালাকায় কি কোনো উস্তাদ আছে? ‘না, নেই’, সঙ্গীরা জানালেন। ইমাম আযম বললেন, ‘এরা কখনোই ফিকহে দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।’[আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ ২/১৬২, খতিব বাগদাদি, দার ইবনুল জাওযি] কেন পারবে না? এর উত্তর খতিব বাগদাদি (৪৬৩ হি.) দিয়েছেন। ইমাম আযমের বক্তব্য উল্লেখ করতে গিয়ে লেখেন, “ফিকহ শিখতে হলে শিক্ষার্থীকে উস্তাদের শরণাপন্ন হতে হবে। উস্তাদের কাছে সে পড়বে। জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা জানতে তাঁর দ্বারস্থ হবে। উস্তাদের কাছ থেকে ইজতিহাদের উসুল ও পথ-পন্থা জানবে। সঠিক ও ভুল মতের মাঝে উস্তাদ পার্থক্য করে দিবেন। তবেই সে ফিকহ (ইলম) শিখতে পারবে।”[প্রাগুক্ত] বলাবাহুল্য, এখানে ফিকহের কথা এলেও সকল ইলমের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।
ইমাম আযমের মুখ থেকেই শুনি, তিনি কীভাবে ফিকহের ইমাম হলেন। ইমাম আযমকে জিজ্ঞাসা করা হলো—‘এত ফিকহি ইলম আপনি কোত্থেকে পেয়েছেন?’
‘আমি ছিলাম ইলম ও ফিকহের আঁতুড়ঘরে। তখন আহলে ইলমদের দরসে যেতে শুরু করলাম। বিশেষভাবে একজন ফকিহের দরসে সবসময় পড়ে রইলাম। তাঁর নাম—হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান। তাঁর কাছ থেকে আমি ফিকহের এই জ্ঞানভাণ্ডার লাভ করেছি।’[মানাকিবু আবি হানিফা, মুওয়াফফাক ম্যাকই, পৃ. ৫২-৫৩]
আবু হানিফাও ইমাম আযম হয়েছেন এই উস্তাদের হাত ধরে। তাঁর মধ্যে ইলমের ব্যুৎপত্তি সৃষ্টি করেছে পরিবার ও পরিবেশ, এবং উস্তাদদের সোহবত।
কিছুক্ষণ আগে আমরা আলাপ করছিলাম ইমাম মালিকের ছাত্র ইমাম ইবনে ওয়াহবকে নিয়ে। এবার উস্তাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইমাম মালিকের কথা শোনা যাক।
—‘যে ব্যক্তি উস্তাদের কাছে ইলম শিখেনি, উস্তাদদের মজলিসে যায়নি, তার কাছ থেকে কি ইলম নেওয়া যাবে?’ ইমাম মালিককে জিজ্ঞাসা করা হলো।
—‘না, যাবে না।’ সংক্ষেপে জবাব দিলেন।
—‘এমন ব্যক্তির কাছ থেকে কি ইলম নেওয়া যাবে, যে নির্ভরযোগ্য, কিন্তু মুখস্থও করতে পারে না, বুঝেও না?’ আবারও জিজ্ঞাসা করা হলো।
—‘ইলম কেবল ওই ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া যাবে, যে মুখস্থ করতে পারে। উস্তাদদের কাছ থেকে ইলম শিখেছে এবং আলিমদের মজলিসে গিয়েছে। ইলম ও আমলের পাশাপাশি যার মধ্যে তাকওয়াও আছে।’[ইসআফুল মুবাত্তা বি-রিজালিল মুওয়াত্তা, পৃ. ১৮০, হাফেজ সুয়ুতি]
উস্তাদবিহীন লোকের কাছ থেকে ইলম গ্রহণ ইলমি গায়রতের পরিপন্থি তো বটেই; বিপথগামিতারও কারণ। একজন আলিম যখন ইলমের দরস দেন, তখন তিনি উস্তাদদের সিলসিলার মাধ্যমে সাহাবা ও সালাফদের ব্যাখ্যা ও ইলমকে ধারণ করেন। পক্ষান্তরে একজন ‘স্বশিক্ষিত’ ব্যক্তি যখন ইলমি বিষয় নিয়ে কথা বলে, তখন তার কথাগুলো হয় আকলপ্রসূত। নিজস্ব চিন্তা, বুদ্ধি ও বিবেচনার আলোকে কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। একাধিক কিতাব থেকে ভিন্ন-ভিন্ন ব্যাখ্যাকে নিজের মতো সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। বলাবাহুল্য, প্রবৃত্তিপ্রসূত এই আলাপ, ব্যাখ্যা ও সমন্বয়গুলো বিপথগামিতা ও গোমরাহির দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। নিজেও বিপথগামী হয়, অন্যকেও বিপথগামী করে।
এজন্যই ইমাম নববী (৬৭৬ হি.) রহ. বলেন, “কেউ যদি একটা মাসয়ালা দশটা কিতাবে দেখে, তবুও তার জন্য সিদ্ধান্ত (ফতোয়া) দেওয়ার অনুমতি নেই। কেননা, হতে পারে ওই কিতাবগুলো দুর্বল কওল বা দুর্বল সনদের ওপর ভিত্তি করে রচিত।”[আল-ফাতাওয়াল হাদিসিয়্যা, পৃ. ২৭, ইবনে হাজার মাক্কি]
ইলম অর্জনে উস্তাদের সরাসরি সোহবত বা সান্নিধ্যের বিকল্প নেই। নবীজির বিশিষ্ট সাহাবি আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তো আরও কয়েক কাঠি বাড়িয়ে বলেছেন। “কাউকে ইলম শিখতে হলে ওঠাবসা, চলাফেরা, সফর—সবকিছুতে আহলে ইলমদের সান্নিধ্য ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, বর্ণনা-৮২১]
কুরআনে বর্ণিত এক মহামানব লুকমান হাকিম রহ.। ইমাম আলুসি রুহুল মাআনিতে লিখেছেন, লুকমান হাকিম নবী নাকি মহামানব—এ নিয়ে মতভিন্নতা পাওয়া যায়। তবে, তাঁর নবী হওয়ার পক্ষে শক্ত দলিল পাওয়া যায় না। লুকমান হাকিমের হিকমাহর কথা কুরআনে বিশেষভাবে বর্ণিত আছে। একটি সূরার নামই হয়ে গেছে লুকমানের নামে। লুকমান তাঁর ছেলেকে নানা হিকমাহর কথা শিখিয়েছেন; নাসিহা দিয়েছেন। কুরআন তারও কিছু নমুনা উল্লেখ করেছে।
ছেলেকে করা এমন এক নাসিহাহর কথা লিখেছেন হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহ.। লুকমান হাকিম ছেলেকে নাসিহা করছেন; “শোনো বাবা, বেশি বেশি আলিমদের সাথে ওঠাবসা করো। তাদের সামনে বারবার হাঁটু গেড়ে বসো। কেননা, আল্লাহ তাআলা অন্তরকে সজীব করেন ইলম ও হিকমাহর দ্বারা। বৃষ্টি দিয়ে যেমন সজীব করেন মৃত জমিনকে।”[জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, বর্ণনা-৬৭৪-৬৭৭]
লুকমান হাকিমের নাসিহায় লুকিয়ে আছে উস্তাদমুখিতার গূঢ় রহস্য; আলিমদের সোহবতে অর্জিত হয় ইলম ও হিকমাহ। আর তা দিয়ে সজীব হয় হৃদয়। এজন্য সালাফরা উস্তাদের দরসে উপস্থিতির জন্য মুখিয়ে থাকতেন। প্রতিযোগিতা করতেন অন্যদের সাথে। প্রয়োজনে স্বীকার করতেন সীমাহীন ত্যাগ ও কষ্ট। এমন কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়ে এই আলাপের ইতি টানছি।
এক.
ইমাম মালিকের বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম। মালিকের পরবর্তীতে তাঁর দরসের মসনদেও আসীন হয়েছিলেন তিনি। প্রতি ভোরে অন্ধকার থাকতেই চলে যেতেন ইমাম মালিকের বাড়িতে। ফজরের আগে ইমাম মালিক যখন বের হতেন, আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম উস্তাদকে একান্তে পাওয়ার সেই সুযোগটা লুফে নিতেন। এরপর সবার সাথে দরসে শরিক হতেন। সেই বিবরণ দিচ্ছেন তিনি নিজ মুখে। “ইমাম মালিকের দরসে আসতাম একদম ভোরে, অন্ধকার থাকতে। সকাল-সকাল তাকে দুই, তিন, চারটা করে মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করতাম। এই সময় ইমাম মালিককে খোশমেজাজে পেতাম। এজন্য প্রতিদিন ভোরেই তার বাড়ির সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। একদিন রাতে ইমাম মালিকের চৌকাঠেই শুয়ে পড়লাম। চোখে নেমে এলো রাজ্যের ঘুম। ঘুমিয়ে গেলাম অজান্তে। এই ফাঁকে ইমাম মালিক মসজিদে চলে গেলেন। এসময় তার বাঁদি পায়ের খোঁচায় আমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, তোমার মনিব বের হয়ে গেছেন। তুমি যতটা গাফলতি করছ, তিনি ততটা গাফেল নন। আজ ঊনচল্লিশ বছর হতে চলল, তিনি এশার অজু দিয়ে ফজর নামাজ পড়েন।”[তারতিবুল মাদারিক (كنت آتي مالكا غلسا) ]
দরসের আগে-আগে আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম ইমাম মালিকের দরবারে এত বেশি যেতেন যে, বাঁদির ধারণা হয়েছিল, আব্দুর রহমান তার গোলাম। এই সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় এভাবেই মাঝেমধ্যে চৌকাঠে শুয়ে পড়তেন। তবু যেন উস্তাদের সান্নিধ্য ছুটে না যায়; ইলমের এতটাই ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
দুই.
‘আসরুর রিওয়ায়াহ’র[ ] প্রাণপুরুষ ছিলেন আলি ইবনুল মাদিনি রহ.। তার দরসে ছাত্রদের প্রচুর ভিড় হতো। সামনের সারিতে জায়গা পাওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা করতে হতো। আলি ইবনুল মাদিনির ছাত্র জাফর ইবনে দুরুস্তুয়াহ সেই প্রতিযোগিতার বিবরণ দিচ্ছেন।
“আলি ইবনুল মাদিনির দরসে বসার জন্য আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যেত। পরের দিনের দরসের জন্য আগেরদিন আসরের সময় আমরা জায়গা ধরে রাখতাম। আগামীকাল যদি দরসে বসার জায়গা না পাই—এই আশঙ্কায় রাতভর সেখানে বসে থাকতাম। এক বৃদ্ধকে দেখলাম মজলিসে বসে একটা পাত্রের মধ্যে পেশাব করলেন। দরস শেষ হওয়া পর্যন্ত পাত্রটা লুকিয়ে রেখে দিলেন। পেশাব করতে গেলে যদি জায়গা দখল হয়ে যায়—এই আশঙ্কায় তিনি দরস থেকে নড়লেন না।”[وقت العصر اليوم لمجلس غد]
তিন.
শেষ করি আবু আলি বাগদাদির ঘটনাটি দিয়ে। তার ছাত্র আবু নাসর একদিন ভিজে চুপসে গিয়ে দরসে উপস্থিত হলো। ছাত্রকে দেখে মনে পড়ে গেল তার নিজের ঘটনা।
‘আবু নাসর, কাছে এসো।’ ছাত্রকে কাছে ডেকে নিলেন। ‘আফসোস করো না। এখন বৃষ্টিতে ভিজেছ। একটু পর শুকিয়ে যাবে। চাইলে কাপড়ও বদল করে নিতে পারবে। কিন্তু, দরসে উপস্থিত হতে গিয়ে আমি যে কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি, তা আমাকে কবর পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যেতে হবে।’ আবু আলি যোগ করলেন।
ছাত্ররা উৎসুক হয়ে উঠল। আবু আলি টের পেলেন। বলতে শুরু করলেন নিজের ঘটনা।
‘আমাদের উস্তাদ ইমাম ইবনে মুজাহিদের দরসে আমি নিয়মিত যেতাম। দরসের সামনের দিকে বসার জন্য আগের দিন রাতেই চলে যেতাম। তো, এক রাতে দরসগাহে উপস্থিত হয়ে দেখি, মজলিসের প্রবেশপথটি বন্ধ। খুলতেও পারছি না। চিন্তিত হয়ে পড়লাম। মনে মনে বললাম, সুবহানাল্লাহ, সকাল পর্যন্ত এখানে বসে অপেক্ষা করব আর অন্যরা আমাকে পিছনে ফেলে সামনের দিকে বসে যাবে? এটা কিছুতেই হতে পারে না।’ আবু আলি দম নিলেন।
‘এরপর খুঁজেটুজে দেখলাম, দরসগাহের পাশ দিয়ে একটি সুড়ঙ্গের মতো দেখা যাচ্ছে। কোনোকিছু না ভেবে সেই সুড়ঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়লাম সোৎসাহে। কষ্টেসৃষ্টে ভিতরে চলেও গেলাম। কিন্তু আমার কাপড় ছিঁড়ে গেল। সুড়ঙ্গের সরু দেয়াল আমার গোশতে দাঁত বসিয়ে দিল। বের হলাম বটে, কিন্তু আঁচড় খেয়ে গোশত কেটে হাড় বেরিয়ে গেল। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ যে, বের হতে পেরেছি। এই অবস্থা নিয়েই শায়খের সম্পূর্ণ দরস করি।’
দম নিয়ে ছাত্র আবু নাসরের দিকে তাকালেন, ‘আমার তুলনায় তোমার এই কষ্ট কী আর এমন হে আবু নাসর?’[আস-সিলাহ, বর্ণনা-১৪৪১, ইবনে বাশকুওয়াল (فأين أنت مما عرض لي)]